-->

বাংলা ছোট গোয়েন্দা গল্প অন্ধকারের আততায়ী

বাংলা ছোট গোয়েন্দা গল্প অন্ধকারের আততায়ী

গল্পঃ অন্ধকারের আততায়ী

লেখকঃ তানভীর চৌধুরী

সকালে ভুলোদার দোকান থেকে বাড়ির জন্য সামান্য কিছু জিনিসপত্র কিনে বাড়ির দিকে হাঁটছিল মিতালি। রাস্তার ওপর রোয়াকে বসে তখন আড্ডা দিচ্ছিল বান্টি আর তার দলবল। এলাকায় কিছুদিন যাবত মারাত্মক হয়ে উঠেছে এই বান্টি আর তার দলের ছেলেরা। যখন তখন মেয়েদের গায়ে হাত দেয় তারা। কেউ কিছু বলতে পারে না তাদের। এমন নয় যে পুলিশ কিছু জানে না বা করে না। স্থানীয় থানার ওসি ঋতব্রত সাহা কিছুদিন আগেই শ্যামলী বলে একটি মেয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে বান্টি আর তার দলের দুটি ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। কিন্তু একবেলাও তাদের লক-আপে ধরে রাখতে পারেননি। বেশ শক্তিশালী রাজনৈতিক মদত আছে তাদের পেছনে। উল্টে সেই রাতেই সবকিছু খোয়াতে হয়েছিল শ্যামলীকে। চরম সর্বনাশ হয়ে যাওয়ার পরেও সবকিছু মাথা পেতে মেনে নিয়ে চুপ করে থাকতে হয়েছে শ্যামলীর বাবা-মাকে। কিন্তু শ্যামলী এই চূড়ান্ত অপমান মেনে নিতে পারেনি। তার মানসিক অবস্থা এখন বিপর্যস্ত। মানসিক বিকারগ্রস্তের দিকে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে শ্যামলী। শ্যামলীর বাবা-মা শুধু বলছেন, তাও তো মেয়েটা বেঁচে আছে। নিজেদের সর্বস্ব খুইয়েও ওর চিকিৎসা চালিয়ে যাব আমরা। কিন্তু বান্টিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে ওরা যদি মেয়েটাকে প্রাণেই মেরে ফেলে, তাহলে তো আমাদের শেষ অবলম্বনও শেষ হয়ে যাবে।

দিনকয়েক আগে অবশ্য বান্টির এক শাগরেদ মুন্না, যাকে বান্টির সাথেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল শ্যামলীর অভিযোগের ভিত্তিতে, তার দেহ দেবগঞ্জের বাজারের কিছু দূরে একটা নালার পাশে গলাকাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশের সন্দেহ বান্টির প্রতিপক্ষ দল ছেনোর ছেলেদের কেউ এই খুন করেছে। ছেনোর ভাই বটাকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছে। বটা এখনও পুলিশের হেফাজতেই রয়েছে, কিন্তু সে এখনও স্বীকার করেনি যে মুন্নাকে সেই খুন করেছে। বান্টি আর তার ছেলেরা শুধু অপেক্ষায় রয়েছে বটার বাইরে আসার। বটাকে জানে মেরে ফেলার জন্য তারা প্রস্তুত। ছেনোও তার দলবল নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। তবে এত কিছুর পরও বান্টি আর তার দলের ছেলেদের নোংরামো বন্ধ হয়নি।

মিতালি বান্টিদের কাছাকাছি আসামাত্রই বাজারি এক হিন্দী গানের কলি আউরে তার সামনে ঝপাঝপ নেমে পড়ল বান্টিরা। তারপরেই মিতালির সালোয়ারের ওড়না একটানে তার গা থেকে খুলে নিল বান্টি। তার শাগরেদরা মিতালির শরীরকে জঘন্যভাবে ছুঁতে শুরু করল। মিতালি প্রথমে আকুতি জানালো, তারপর মিনতি করল তাতেও কাজ না হওয়ায় মরিয়া হয়ে সে বান্টিকে চড় মারতে গেল। বান্টি মিতালির হাত সজোরে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে তার সাথে দুর্ব্যবহারের চরম করতে শুরু করল।

সকালবেলায় প্রকাশ্য রাস্তায় সকলের সামনে এই ঘটনা ঘটছে, অথচ সবাই দেখেও দেখছে না। এই সময় মিতালি দেখল তার পাশের বাড়ির সুবোধ বাজারের থলি হাতে সেই পথ দিয়ে আসছে। মিতালি মরিয়া হয়ে তাকেই ডাকল

সুবোধদা, সুবোধদা আমাকে বাঁচান প্লিজ, দেখুন, দেখুন এরা কি করছে? সুবোধদা প্লিজ দয়া করে আমাকে বাঁচান সুবোধদা। আমি তো আপনার বোনের মতন’।

সুবোধ কিংকর্তব্য বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে রইল। বান্টি সুবোধের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,

‘কি বে কি দেখছিস? ভালো চাস তো সরে পড়। নইলে নিজের বোনের হালাতটা মনে আছে তো? এখন তো পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। তোর আরেকটা বোন আছে না। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। আমাদের ব্যাপারে নাক গলাবি তো ওটাকেও তুলে এনে ওটারও একদম একই হালাত করে দেব, যা ফোট বে, ফোট’।

সুবোধ মাথা নীচু করে চলে গেল। মিতালির আর্ত চিৎকার তার কানে পৌছলেও সে তা না শোনার ভান করে চলে গেল। বান্টি এই সুযোগে মিতালিকে জাপটে ধরে তাকে মাটি থেকে শূন্যে তুলে নিয়ে শয়তানি হাসি হেসে বলতে লাগল,

‘তোমাকে এবার কে বাঁচাবে খুকুমণি। আমার সাথে যদি ভালোয় ভালোয় কোওপারেট না কর তাহলে এখান থেকেই তুলে নিয়ে যাবো। ভালো চাও তো লক্ষ্মী মেয়ের মত আজ রাতে আমার ডেরায় চলে এস তোমাকে রানী করে দেব’।

বলেই আবার একটা ক্রুর হাসি হাসল বান্টি। তার দলের ছেলেরা তখন জানেমন জানেমন বলে মিতালির শরীরের সর্বত্র তাদের নোংরা স্পর্শ দিয়ে চলেছে।

ঠিক তখনই একটা সাইরেনের আওয়াজ শোনা গেল, যেটা উল্টোদিকে থেকে আসছে। সঙ্গে সঙ্গেই একটা পুলিশের জিপ এসে দাঁড়ালো বান্টিদের সামনে। অফিসার ঋতব্রত সাহা জিপ থেকে নেমে এলেন। তাকে দেখে বান্টিরা মিতালিকে ছেড়ে দিল। ঋতব্রত সাহা বান্টিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

‘কি হচ্ছে এসব? দিনের বেলায় নোংরামো করার আর জায়গা পাসনি। যা এখান থেকে। ছাড় এই মেয়েটাকে, চলে যা এখান থেকে’।

বান্টি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

‘আরে ইনস্পেক্টার স্যার যে, আবার আইন কপচাচ্ছেন? আমরা আইনকে যে কোথায় রাখি তা তো আপনি ভালো করেই জানেন স্যার, আপনি যখন বলছেন তখন আর আপনাকে ধরম সঙ্কটে ফেলব না। মামণি তুমি এখন বাড়ি যাও, কিন্তু রাতের কথাটা মনে রেখো, না হলে কি করব আগেই বলেছি, এই স্যারের কাছ থেকে জেনে নাও, স্যারের কাছে রেফারেন্স আছে, আমার কথা না শুনলে কি হয়? চলি স্যার’।

বেশ রেলা দেখিয়েই বান্টি তার দলবল নিয়ে চলে গেল।

মিতালি ঘৃণা ভরা দৃষ্টি নিয়ে বান্টিদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর মুখ ঘুরিয়ে ঋতব্রত সাহার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

‘এই নোংরা জানোয়ারগুলোর থেকেও আমার ঘৃণা হয় আপনাদের মত লোকেদের দেখলে। আমার পাশের বাড়ির সুবোধদা আমাকে এদের খপ্পরে অসহায় অবস্থায় দেখেও মাথা নীচু করে চলে গেল। আশপাশ দিয়ে চলে যাওয়া লোকেরাও সবকিছু দেখে না দেখার ভান করে চলে গেল। আর আপনিও দেখলাম স্যার ওই বান্টি আর তার দলের সামনে ভিজে বেড়াল হয়ে থাকল। আপনার সামনে ওরা আমাকে হুমকি দিয়ে চলে গেল তবুও আপনি কিচ্ছু করলেন না। ওদের ধরলেন না পর্যন্ত। আপনারা নাকি আমাদের রক্ষক? ছিঃ স্যার ছিঃ’।

ঋতব্রত সাহা মাথা গরম করলেন না, শুধু বললেন, ‘তোমার ভালোর জন্যই ওদের গায়ে হাত দিইনি। দু’দুবার আমার এ বিষয়ে শিক্ষা হয়েছে। একবার শ্যামলীর কেসে আর একবার ওই তুমি যার নাম করলে সেই সুবোধের বড় বোনের কেসে। আমি আইনের পথে ডায়নামিক হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এইসব গুণ্ডাদের হাত এখন অনেক ওপরে। ওদের কোনও শাস্তি তো আমি দিতে পারিনি উল্টে দুটো জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। সেই অবস্থা যাতে তোমার না হয়, তাই কিছু বললাম না। এখন এস গাড়িতে ওঠ, তোমাকে বাড়ি পৌছে দিচ্ছি’।

মিতালি ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘থাক, অনেক করেছেন স্যার, ধন্যবাদ, আর কোনও উপকার করতে হবে না। আমার বাড়ি এখানেই, আমি নিজেই চলে যেতে পারব’।

মিতালি জোরে পা ফেলে হেঁটে এগিয়ে গেল। সেইদিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে ঋতব্রত সাহা আবার জিপে উঠে বসে ড্রাইভারকে বললেন, ‘চল থানায় চল’। সন্ধ্যে থেকেই আকন্ঠ মদ্যপান করছে বান্টি আর তার ছেলেরা। বান্টি তার রাজনৈতিক মদতদাতা শিবুদার জবর দখল করা একটা পুরনো একতলা বাড়িতেই নিজের ঠেক বানিয়ে নিয়েছে। রাত একটু ঘন যখন হয়েছে তখন বান্টিদের নেশাও চরমে পৌছেছে। একসময় বান্টি উঠে দাঁড়িয়ে তার চ্যালাচামুন্ডাদের বলল, ‘তোরা সুরাপান করতে থাক, আমি একটু একনম্বর মাইনাস করে আছি, আরেকটু পরেই তো আমাদের বুলবুলি এসে পড়বে, তখন আর সময় পাবো না এসব করার’।

ঝন্টু বলল, ‘বুলবুলি আসবে গুরু?’

বান্টি বলে উঠল, ‘আলবাত আসবে। বান্টি ওস্তাদের কথা অমান্য করলে কি হয় জানিস না। সোজা সবাই মিলে বুলবুলির বাড়িতে ঢুকে গিয়ে ওর বাবা-মার চোখের সামনে একসাথে ফুলশয্যা করে আসব’।

বলেই টলতে টলতে সে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। মূল ঘর থেকে টয়লেটটা একটু দূরে। খোলা জায়গা পেরিয়ে জমির একটা কোণের দিকে পাঁচিলের প্রায় গা ঘেঁষে একটা টয়লেট ঘর। বান্টি নেশার ঘোরে টলতে টলতে সেদিকেই এগোলো। টয়লেট ঘরের টিনের দরজায় পৌছনোর কয়েক হাত দূরেই একটা সবল হাত বান্টিকে পেছন থেকে চেপে ধরল। নেশাগ্রস্ত বান্টি নিজেকে ছাড়াতে পারল না। গ্লাভস পরা শক্ত হাতটা বান্টির গলা পেছন থেকে জাপটে ধরল। বান্টি চিৎকার করতে গেল কিন্তু তার আগেই হাতটা গলা পেঁচানো অবস্থাতেই বান্টির মুখটা চেপে ধরল। মুহুর্তের মধ্যে অন্য একটা হাত ঝলসে উঠল বান্টির চোখের সামনে। সেই হাতে একটা ধারালো ছুরি বান্টি অন্ধকারের মধ্যেও ঝলসে উঠতে দেখে শিউরে উঠল। কিন্তু সে আর বেশী সময় পেল না। মুহুর্তে সেই ছুরি বান্টির গলার নলি কেটে দিল। নলি কাটার সঙ্গে সঙ্গেই শক্ত হাত দুটো বান্টিকে ছেড়ে দিল। পেছন ঘুরে মাটিতে উল্টে পড়ার সময় বান্টি একঝলক সেই অন্ধকারের আততায়ীর মুখ দেখতে পেল। মৃত্যু যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে হতবাক হয়ে বান্টি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নিথর হয়ে গেল। আততায়ী বান্টির লাশটা তুলে নিয়ে তার শক্ত কাঁধে ফেলে ক্ষয়ে যাওয়া পাঁচিলের একটা ভাঙা অংশের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে গেল।

জমিটার পেছনেই জঙ্গল, সেই জঙ্গল দিয়ে বান্টির লাশ কাঁধে কিছুদূর এগিয়ে গেল আততায়ী। জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা ভেতরে একটা পরিত্যক্ত টিনের ঘর, সেখানে অন্ধকারের মধ্যে আরেকজন শক্ত সমর্থ পুরুষ অপেক্ষা করে আছে। আততায়ী বান্টির লাশটা নিয়ে এসে সেই টিনের ঘরের পাশে শুইয়ে দিল। তারপর অপেক্ষারত দ্বিতীয়জনকে বলল,

‘জানোয়ারটা যখন সকালে ওই মিতালি বলে মেয়েটার সঙ্গে অসভ্যতামো করছিল, তখনই মনে হচ্ছিল মেরে দিই। আমার বোন চন্দ্রানীর সর্বনাশ করে তাকে চিরজীবনের জন্য বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে এই শয়তানগুলো, কিন্তু ছোট বোন ইন্দ্রানীর মুখটা মনে করে নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম দাদা’।

দ্বিতীয় ব্যক্তি এবারে আততায়ীর কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘নিজেকে সামলাও সুবোধ, আমি নিজেকে সামলে রেখেছি। এই ঋতব্রত সাহা একজন পুলিশ অফিসার হয়েও যখন বারবার এই শয়তানগুলোর কাছে হেরে যেত তখন নিজের প্রতি নিজেরই ঘেন্না হত। আইন যখন দুষ্টের দমন করতে ব্যর্থ হয় তখন আইনের বাইরে গিয়েই অপরাধের শাস্তি দিতে হয়। এখন আইনের চোখে আমি-তুমি দুজনেই অপরাধী সুবোধ, কিন্তু আমার কাছে আইনের উপরে মানবতা। মানুষকে বাঁচাতে যদি আইন হাতে তুলে নিতে হয়, তাহলে আমার কাছে সে অপরাধ কোনও অপরাধ নয়। এই শয়তানগুলোকে যখন আমরা আইনের পথা সাজা দিতে পারব না তখন এই সমাজের অভিশাপগুলোকে এভাবেই সমাজ থেকে মুছে দিতে হবে। আমি এই এলাকায় আর কোনও শ্যামলী আর চন্দ্রানী হতে দেব না। কিন্তু এদের শাস্তি দিতে গেলে দিনের আলোয় আমাদের অসহায় ভালোমানুষ সেজেই থাকতে হবে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে আমরা আততায়ী হয়ে এদের একে একে যমের দুয়ারে পাঠাবো। এই টিনের ঘরটা একসময় ছেনোর আড্ডা ছিল। এখন সে ব্যাটা গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। তুমি আর এখানে থেকো না, আমিও সরে পড়ছি। আগামীকাল সকালে এই লাশ কেউ না কেউ দেখবেই। থানায় খবর গেলে আমি দলবল নিয়ে এখানে আসব আর এই মার্ডারও আমি ছেনোর দলের ঘাড়েই চাপাবো। ওইগুলোও একইরকম আপদ। এভাবে যদি দু’পক্ষই নিকেশ হয় ক্ষতি কি? একদলকে আমরা সরাবো, অন্যপক্ষকে আইন সরিয়ে দেবে। এখন এখান থেকে চলে যাও, সমাজকে কলঙ্ক মুক্ত করার তালিকায় এখনও অনেক নাম বাকি আছে’।

ঋতব্রত সাহার কথা শেষ হতেই সুবোধ তার সঙ্গে করমর্দন করে নিজের বাড়ির দিকে এগোলো। বান্টির লাশকে পিছনে ফেলে ঋতব্রত সাহাও উল্টোদিকে হাঁটা ফেললেন।

সমাপ্ত
আরও নতুন পোষ্ট

Facebook